ঢাকা ১২:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল পাচ্ছে ইরান?

  • অনলাইন ডেক্স
  • আপলোড সময় : ০৭:৪৪:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
  • ২১১ Time View

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি সম্পাদিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় তেহরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ তহবিল গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বাজার ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দেওয়া দীর্ঘ যুদ্ধ অবসানের অংশ হিসেবে আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। 

গত রোববার (১৪ জুন) দুই পক্ষ ডিজিটাল মাধ্যমে চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করে। তবে মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই বিনিয়োগ তহবিলটি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের কোনো আর্থিক পুরস্কার বা মূল্য পরিশোধ নয়।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই আর্থিক প্রণোদনা সম্পূর্ণভাবে চুক্তির শর্ত পালনে ইরানের ‘পারফরম্যান্স’ বা কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে। 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন জনগণের অর্থ সরাসরি ইরানে যাবে না এবং ইরানের ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ থাকা সম্পদ অবমুক্ত করার খবরটিও সঠিক নয়। মূলত এই তহবিলটি গঠন করবে পারস্য উপসাগরীয় উপকূলীয় জোট (গালফ কোস্ট কোয়ালিশন) এবং এটি মূলত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।  

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সিনিয়র ফেলো মুহানাদ সেলুম এই প্রক্রিয়াটিকে ওয়াশিংটনের জন্য একটি ‘উইন-উইন’ বা ঝুঁকিমুক্ত সমাধান হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ইরান যদি নিজের সংশোধন করে তবে এই শান্তির কৃতিত্ব পাবে মার্কিন প্রশাসন, আর যদি তারা চুক্তি ভঙ্গ করে তবে আমেরিকার কোনো আর্থিক ক্ষতি হবে না, বরং পুরো ঝুঁকি থাকবে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই যুদ্ধের কারণে ইরানে আনুমানিক ২৯ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং দেশটির সাধারণ মানুষ ১৯৪২ সালের পর সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তহবিল ইরানের অর্থনীতির জন্য একটি বড় লাইফলাইন হতে পারে। 

তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম মেহর নিউজ দাবি করেছে, চুক্তির ১৪ দফা খসড়ায় ইরানের অবরুদ্ধ থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যদিও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট এই দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আগামী শুক্রবার চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বেশ কিছু জটিল ও বিতর্কিত বিষয় নিয়ে দুই পক্ষ পরবর্তী ৬০ দিন আলোচনা চালিয়ে যাবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের কাছে থাকা ৪৪০ কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আত্মসমর্পণ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তির নিয়মিত পরিদর্শন এবং বিতর্কিত হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ শুল্কমুক্তভাবে উন্মুক্ত করা। একই সাথে লেবাননে চলমান ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধের বিষয়টিও এই আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ ইরান তাদের মিত্র দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানালেও ইসরাইল ইতোমধ্যে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এই ঐতিহাসিক চুক্তি নিয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, এই চুক্তি ইরানের অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনবে, তবে তেহরান অতীতে চুক্তি ভঙ্গের ইতিহাস ভুলে যায়নি। 

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, আমেরিকার প্রকৃত প্রতিশ্রুতি পরীক্ষা করার জন্যই ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এই চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। অন্যদিকে, ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘ন্যায্য ও ভালো’ বলে অভিহিত করে সতর্ক করেছেন, ইরান কখনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। কাতারসহ বৈশ্বিক নেতারা এই চুক্তিকে স্বাগত জানালেও মার্কিন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় পক্ষের আইনপ্রণেতারাই চুক্তির স্বচ্ছতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো কিছুটা সন্দিহান।

সূত্র: আল-জাজিরা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন
Tag :

৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল পাচ্ছে ইরান?

আপলোড সময় : ০৭:৪৪:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি সম্পাদিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় তেহরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ তহবিল গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বাজার ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দেওয়া দীর্ঘ যুদ্ধ অবসানের অংশ হিসেবে আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। 

গত রোববার (১৪ জুন) দুই পক্ষ ডিজিটাল মাধ্যমে চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করে। তবে মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই বিনিয়োগ তহবিলটি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের কোনো আর্থিক পুরস্কার বা মূল্য পরিশোধ নয়।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই আর্থিক প্রণোদনা সম্পূর্ণভাবে চুক্তির শর্ত পালনে ইরানের ‘পারফরম্যান্স’ বা কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে। 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন জনগণের অর্থ সরাসরি ইরানে যাবে না এবং ইরানের ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ থাকা সম্পদ অবমুক্ত করার খবরটিও সঠিক নয়। মূলত এই তহবিলটি গঠন করবে পারস্য উপসাগরীয় উপকূলীয় জোট (গালফ কোস্ট কোয়ালিশন) এবং এটি মূলত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।  

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সিনিয়র ফেলো মুহানাদ সেলুম এই প্রক্রিয়াটিকে ওয়াশিংটনের জন্য একটি ‘উইন-উইন’ বা ঝুঁকিমুক্ত সমাধান হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ইরান যদি নিজের সংশোধন করে তবে এই শান্তির কৃতিত্ব পাবে মার্কিন প্রশাসন, আর যদি তারা চুক্তি ভঙ্গ করে তবে আমেরিকার কোনো আর্থিক ক্ষতি হবে না, বরং পুরো ঝুঁকি থাকবে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই যুদ্ধের কারণে ইরানে আনুমানিক ২৯ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং দেশটির সাধারণ মানুষ ১৯৪২ সালের পর সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তহবিল ইরানের অর্থনীতির জন্য একটি বড় লাইফলাইন হতে পারে। 

তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম মেহর নিউজ দাবি করেছে, চুক্তির ১৪ দফা খসড়ায় ইরানের অবরুদ্ধ থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যদিও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট এই দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আগামী শুক্রবার চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বেশ কিছু জটিল ও বিতর্কিত বিষয় নিয়ে দুই পক্ষ পরবর্তী ৬০ দিন আলোচনা চালিয়ে যাবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের কাছে থাকা ৪৪০ কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আত্মসমর্পণ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তির নিয়মিত পরিদর্শন এবং বিতর্কিত হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ শুল্কমুক্তভাবে উন্মুক্ত করা। একই সাথে লেবাননে চলমান ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধের বিষয়টিও এই আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ ইরান তাদের মিত্র দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানালেও ইসরাইল ইতোমধ্যে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এই ঐতিহাসিক চুক্তি নিয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, এই চুক্তি ইরানের অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনবে, তবে তেহরান অতীতে চুক্তি ভঙ্গের ইতিহাস ভুলে যায়নি। 

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, আমেরিকার প্রকৃত প্রতিশ্রুতি পরীক্ষা করার জন্যই ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এই চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। অন্যদিকে, ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘ন্যায্য ও ভালো’ বলে অভিহিত করে সতর্ক করেছেন, ইরান কখনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। কাতারসহ বৈশ্বিক নেতারা এই চুক্তিকে স্বাগত জানালেও মার্কিন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় পক্ষের আইনপ্রণেতারাই চুক্তির স্বচ্ছতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো কিছুটা সন্দিহান।

সূত্র: আল-জাজিরা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন