মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) নিজের গোপন সফরের তথ্য জনসমক্ষে এনে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন ঝড় তুলেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
গত ১৩ মে নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে দাবি করা হয়, যুদ্ধের সময় তিনি অত্যন্ত গোপনে আমিরাত সফর করে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের (এমবিজেড) সঙ্গে এক ‘ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী’ বৈঠক করেছেন। তবে এই তথ্য ফাঁসের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আবুধাবির এমন অনড় অস্বীকৃতির পরও ইসরাইলের শীর্ষ সারির সংবাদমাধ্যমগুলো সফরের খুঁটিনাটি বিবরণ প্রকাশ করে আমিরাতকে এক চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরাইল’ সুনির্দিষ্ট করে জানিয়েছে, গত ২৬ মার্চ ওমানের সীমান্তবর্তী মরূদ্যান শহর আল-আইনে এই শীর্ষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিমানবন্দর থেকে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ নিজেই ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে নেতানিয়াহুকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যান। একই সময়ে তেল আবিব থেকে দুটি বিশেষ বিমানের আল-আইন যাওয়ার ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য এবং নেতানিয়াহুর সাবেক চিফ অব স্টাফ জিভ আগমনের ফেসবুক পোস্ট এই সফরের সত্যতা আরও জোরালো করে। শুধু নেতানিয়াহুই নন, মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্র ধরে জানা গেছে যে, যুদ্ধের সময় ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও শিন বেতের প্রধান এবং সামরিক প্রধানও আমিরাত সফর করেছিলেন, এমনকি আমিরাতের মাটিতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ পরিচালনায় ইসরাইলি সেনাও মোতায়েন করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই গোপন সফরের খবরটি ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁস করার পেছনে নেতানিয়াহুর গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে। চলতি বছরের শেষের দিকে ইসরাইলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং দেশে দুর্নীতি মামলার মুখোমুখি হওয়া নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক মহলে নিজেকে একঘরে দশা থেকে মুক্ত দেখাতে মরিয়া।
এই তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে তিনি দেশের জনগণকে বোঝাতে চেয়েছেন যে গাজা ও ইরানের সাথে যুদ্ধের পরও ২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা আরব-ইসরাইল শান্তি চুক্তি বহাল রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী নেতারা এখনো তাকে স্বাগত জানান। পাশাপাশি ইরান যে ইসরাইলকে একঘরে করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেই বার্তাও তিনি এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন।
অন্য দিকে, আবুধাবির জন্য এই সফরের সত্যতা স্বীকার করা এক বড় ধরনের কৌশলগত বিপর্যয় ডেকে আনত। গাজায় চলমান নির্মমতার কারণে পুরো আরব ও মুসলিম বিশ্বে যখন ইসরাইল-বিরোধী ক্ষোভ তুঙ্গে, তখন নেতানিয়াহুর সাথে যুদ্ধকালীন বৈঠকের কথা স্বীকার করা মানে আমিরাতের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হওয়া। তাছাড়া, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের সময় আমিরাতের দিকে ধেয়ে আসা শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে আবুধাবি ভালো করেই জানে যে ইসরাইলের সাথে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার কথা প্রকাশ্যে এলে তা তেহরানের কট্টরপন্থীদের নতুন করে ক্ষুব্ধ করবে, যা আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা ও নিরাপদ ব্যবসায়িক হাব হিসেবে আন্তর্জাতিক ইমেজকে হুমকির মুখে ফেলবে
নেতানিয়াহুর এই একতরফা তথ্য ফাঁসের নীতি মূলত আমিরাতকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করার এবং ইসরাইলের ওপর তাদের নিরাপত্তা নির্ভরতা বাড়িয়ে দেওয়ার একটি ‘ভাগ কর এবং শাসন কর’ কৌশল।
এর আগে ২০২০ সালেও নেতানিয়াহু সৌদি আরবের ‘নিওম’ শহরে নিজের গোপন সফরের কথা একইভাবে ফাঁস করেছিলেন, যার প্রতিক্রিয়ায় রিয়াদ ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথ থেকে সরে আসে। আবুধাবির সঙ্গে ইসরাইলের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক অনেক গভীর হলেও, নেতানিয়াহুর এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থের খেলার পর আমিরাতের নীতি-নির্ধারকদের মনেও এখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে, ইসরাইলের সাথে এই বন্ধুত্বের মাশুল শেষ পর্যন্ত তাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে কি না।
অনলাইন ডেক্স 



















