ঢাকা ০২:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সেদিন সংবিধান ‘ছুড়ে ফেলা’ নিয়ে ঠিক কী বলছিলেন খালেদা জিয়া

  • অনলাইন ডেক্স
  • আপলোড সময় : ০৪:২৩:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
  • ২২৩ Time View

বাহাত্তরের সংবিধান বাতিল বা ‘ছুড়ে ফেলা’ নিয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুরোনো একটি বক্তব্য। বিশেষ করে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের দাবি—খালেদা জিয়াও নাকি এই সংবিধান ছুঁড়ে ফেলার কথা বলেছিলেন। বস্তুত তার বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও ভাষ্য নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ব্যাখ্যা।

সম্প্রতি কিছু রাজনৈতিক দল ও তরুণ নেতাদের পক্ষ থেকে ‘বাহাত্তরের সংবিধান’ বাতিল বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি জোরালো হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ।

পার্থ বিরোধী দলের উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন, ‘সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলব কেন? সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় যে, এটা একাত্তরের পরাজয়ের দলিল? সংবিধান নিয়ে এত গাত্রদাহ কেন?’

আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানের সঙ্গে লাখো শহীদের রক্তের ঋণ জড়িয়ে আছে। লাখো মা বোনের সম্ভ্রম জড়িয়ে আছে। এই সংবিধানকে সামনে রেখেই যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।’

এর আগে গত ২৯ মার্চ জাতীয় সংসদে এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন,  ‘জেন-জি’রা আর বাহাত্তরের সংবিধান চায় না।’

পরদিন জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বিএনপিকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘যে সংবিধান খালেদা জিয়া ছুড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন, সেই বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতি সরকারি দলের কেন এত প্রেম জাগ্রত হলো, তা জনগণ জানতে চায়।’ 

এরপর মঙ্গলবার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতার মূলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় জামায়াত ও এনসিপির আরও অনেক এমপি একই সুরে কথা বলেন। তারা বিএনপিকেও প্রশ্ন করেন—যে সংবিধান খালেদা জিয়া নাকি বাতিল করতে চেয়েছিলেন, সেটির প্রতি এখন কেন সমর্থন।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, কিছুক্ষণ আগে মাননীয় সংসদ সদস্য পার্থ যখন বক্তব্য দিচ্ছেলেন- উনি যখন বললেন সংবিধান যারা ছুড়ে ফেলতে চান তাদেরকে স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে অ্যালাইনমেন্ট করলেন; তখন সরকারি দলের মন্ত্রীরা টেবিল চাপড়ে সেটাকে সমর্থন জানালেন। 

হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, খালেদা জিয়া যিনি গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন সংগ্রাম করে গেছেন; উনি বলেছিলেন- যখন জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে; যেদিন এ পার্লমেন্ট জনতার সরকারের কাছ যাবে সেদিন এ সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে। ট্রেজারি বেঞ্চে যে মন্ত্রীরা আছেন তারা দীর্ঘদিন বেগম জিয়ার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। এ সংবিধান ছুড়ে ফেলার সঙ্গে স্বাধীনতা ও যুদ্ধারাধীর অ্যালাইনমেন্ট করার যে হাততালি যারা দিয়েছেন- সেটার মধ্য দিয়ে তারা বেগম জিয়াকে অপমান করেছেন কিনা তারা সেটা ভেবে দেখবেন।

আসলে কী বলেছিলেন খালেদা জিয়া

২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে বিএনপি এই সংশোধনের বিরোধিতা করে। ওই বছরের ১৩ জুলাই এক গণঅনশন কর্মসূচিতে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ বিভিন্ন সংশোধনী এনেছে। আমরা বলতে চাই, এসব সংশোধনী আওয়ামী ইশতেহার। এটা জনগন মানে না। আগামী সরকার পরিবর্তনের পর এসব সংশোধনী ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবে।’ 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানে তিনি পুরো সংবিধান নয় বরং নির্দিষ্ট কিছু সংশোধনী বাতিলের কথাই উল্লেখ করেছিলেন।

এ নিয়ে আওয়ামী লীগ বিতর্ক সৃষ্টি করতে থাকলে সে সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রয়াত মওদুদ আহমদ বলেন, ‘সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে বা গ্রহণযোগ্য নয়— খালেদা জিয়ার এ অভিপ্রায়ের অর্থ হচ্ছে তার দল ক্ষমতায় গেলে পঞ্চদশ সংশোধনী পরিবর্তন করবে।’

তথ্যানুযায়ী, খালেদা জিয়া সরাসরি সংবিধান বাতিলের কথা বলেননি বরং তিনি নির্দিষ্ট সংশোধনীগুলো বাতিলের কথা বলেছেন। ফলে তার বক্তব্যকে পুরো সংবিধান ‘ছুড়ে ফেলার’ আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করা কতটা সঠিক—তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

কক্সবাজারে মাছের পিকআপে পাচারকালে ১ লাখ ৭১ হাজার ইয়াবাসহ আটক ২

সেদিন সংবিধান ‘ছুড়ে ফেলা’ নিয়ে ঠিক কী বলছিলেন খালেদা জিয়া

আপলোড সময় : ০৪:২৩:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

বাহাত্তরের সংবিধান বাতিল বা ‘ছুড়ে ফেলা’ নিয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুরোনো একটি বক্তব্য। বিশেষ করে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের দাবি—খালেদা জিয়াও নাকি এই সংবিধান ছুঁড়ে ফেলার কথা বলেছিলেন। বস্তুত তার বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও ভাষ্য নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ব্যাখ্যা।

সম্প্রতি কিছু রাজনৈতিক দল ও তরুণ নেতাদের পক্ষ থেকে ‘বাহাত্তরের সংবিধান’ বাতিল বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি জোরালো হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ।

পার্থ বিরোধী দলের উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন, ‘সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলব কেন? সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় যে, এটা একাত্তরের পরাজয়ের দলিল? সংবিধান নিয়ে এত গাত্রদাহ কেন?’

আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানের সঙ্গে লাখো শহীদের রক্তের ঋণ জড়িয়ে আছে। লাখো মা বোনের সম্ভ্রম জড়িয়ে আছে। এই সংবিধানকে সামনে রেখেই যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।’

এর আগে গত ২৯ মার্চ জাতীয় সংসদে এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন,  ‘জেন-জি’রা আর বাহাত্তরের সংবিধান চায় না।’

পরদিন জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বিএনপিকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘যে সংবিধান খালেদা জিয়া ছুড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন, সেই বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতি সরকারি দলের কেন এত প্রেম জাগ্রত হলো, তা জনগণ জানতে চায়।’ 

এরপর মঙ্গলবার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতার মূলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় জামায়াত ও এনসিপির আরও অনেক এমপি একই সুরে কথা বলেন। তারা বিএনপিকেও প্রশ্ন করেন—যে সংবিধান খালেদা জিয়া নাকি বাতিল করতে চেয়েছিলেন, সেটির প্রতি এখন কেন সমর্থন।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, কিছুক্ষণ আগে মাননীয় সংসদ সদস্য পার্থ যখন বক্তব্য দিচ্ছেলেন- উনি যখন বললেন সংবিধান যারা ছুড়ে ফেলতে চান তাদেরকে স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে অ্যালাইনমেন্ট করলেন; তখন সরকারি দলের মন্ত্রীরা টেবিল চাপড়ে সেটাকে সমর্থন জানালেন। 

হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, খালেদা জিয়া যিনি গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন সংগ্রাম করে গেছেন; উনি বলেছিলেন- যখন জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে; যেদিন এ পার্লমেন্ট জনতার সরকারের কাছ যাবে সেদিন এ সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে। ট্রেজারি বেঞ্চে যে মন্ত্রীরা আছেন তারা দীর্ঘদিন বেগম জিয়ার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। এ সংবিধান ছুড়ে ফেলার সঙ্গে স্বাধীনতা ও যুদ্ধারাধীর অ্যালাইনমেন্ট করার যে হাততালি যারা দিয়েছেন- সেটার মধ্য দিয়ে তারা বেগম জিয়াকে অপমান করেছেন কিনা তারা সেটা ভেবে দেখবেন।

আসলে কী বলেছিলেন খালেদা জিয়া

২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে বিএনপি এই সংশোধনের বিরোধিতা করে। ওই বছরের ১৩ জুলাই এক গণঅনশন কর্মসূচিতে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ বিভিন্ন সংশোধনী এনেছে। আমরা বলতে চাই, এসব সংশোধনী আওয়ামী ইশতেহার। এটা জনগন মানে না। আগামী সরকার পরিবর্তনের পর এসব সংশোধনী ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবে।’ 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানে তিনি পুরো সংবিধান নয় বরং নির্দিষ্ট কিছু সংশোধনী বাতিলের কথাই উল্লেখ করেছিলেন।

এ নিয়ে আওয়ামী লীগ বিতর্ক সৃষ্টি করতে থাকলে সে সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রয়াত মওদুদ আহমদ বলেন, ‘সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে বা গ্রহণযোগ্য নয়— খালেদা জিয়ার এ অভিপ্রায়ের অর্থ হচ্ছে তার দল ক্ষমতায় গেলে পঞ্চদশ সংশোধনী পরিবর্তন করবে।’

তথ্যানুযায়ী, খালেদা জিয়া সরাসরি সংবিধান বাতিলের কথা বলেননি বরং তিনি নির্দিষ্ট সংশোধনীগুলো বাতিলের কথা বলেছেন। ফলে তার বক্তব্যকে পুরো সংবিধান ‘ছুড়ে ফেলার’ আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করা কতটা সঠিক—তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন